বিষ্ণুপুর ডিহর গ্রামের ঐতিহাসিক বাবা ষাঁড়েশ্বর মন্দির সংস্কারের পর নতুন রূপে


বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া: মল্লভুমের লালমাটির বুকে এক নতুন আধ্যাত্মিক অধ্যায়ের সূচনা হলো। বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর মহকুমার ডিহর গ্রামে অবস্থিত হাজার বছরের প্রাচীন বাবা ষাঁড়েশ্বর (সারেশ্বর) মন্দির দীর্ঘ ছয় বছর সংস্কারের পর পুনরায় সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। ১৩৪৬ সালে নির্মিত এই স্থাপত্যটির পুনরুজ্জীবন কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি বাংলার বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক রাজকীয় প্রত্যাবর্তন।

মল্লরাজ পৃথ্বী মল্ল নির্মিত ল্যাটেরাইট পাথরের ষাঁড়েশ্বর মন্দির স্থাপত্য
১৩৪৬ সালে মল্লরাজ পৃথ্বী মল্লের নির্মিত ঐতিহাসিক স্থাপত্য।


১. ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপট: মল্লরাজ পৃথ্বী মল্ল ও মন্দির নির্মাণের ইতিহাস 

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ১৩৪৬ সালে বিষ্ণুপুরের ৩৭তম মল্লরাজা পৃথ্বী মল্ল ল্যাটেরাইট বা মাকড়া পাথর দিয়ে এই বিশাল মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। স্থাপত্যরীতিতে এটি ওড়িশার 'রেখ দেউল' শৈলীর প্রভাব বহন করে। বর্তমানে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (ASI) দ্বারা সংরক্ষিত এই মন্দিরটি মল্লরাজাদের শিবভক্তির এক জীবন্ত নিদর্শন।

ষাঁড়েশ্বর মন্দিরের গর্ভগৃহে বাবা ভৈরব রাজের অলৌকিক ঐতিহ্য


বাবা ভৈরব রাজের অলৌকিক কাহিনী 

মল্লরাজাদের আমল থেকেই এই মন্দিরের সাথে এক অনন্য ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। বাবা ষাঁড়েশ্বরের সাথেই মন্দিরের গর্ভগৃহে বিরাজ করেন বাবা ভৈরব রাজ। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, তিনি এখানে অশ্ব বা ঘোড়া রূপে অবস্থান করেন। কথিত আছে, যতক্ষণ বাবা ষাঁড়েশ্বরের মন্দির অক্ষত থাকবে, বাবা ভৈরব রাজের এই রূপটিও অবিনশ্বর থাকবে। প্রতি বছর চৈত্র গাজনের সাত দিন আগে তিনি নিজের মন্দিরে গমন করেন এবং পহেলা বৈশাখের রাতে পুনরায় ফিরে আসেন—এই প্রথা মল্ল আমল থেকে আজও একইভাবে চলে আসছে।

২. কেন প্রয়োজন ছিল এই সংস্কারের? 

দীর্ঘ সময় ধরে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মন্দিরটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল:
• কানানদীর প্রভাব: মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কানানদীর (দ্বারকেশ্বর) জলের তোড়ে মন্দিরের ভিত্তি (Foundation) কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

• প্রাকৃতিক দুর্যোগ: ভূমিকম্পের ফলে মন্দিরের প্রাচীন দেওয়ালে ফাটল দেখা দিলে সংস্কার অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
২০২০ সালে ASI ওড়িশার দক্ষ কারিগরদের সহায়তায় সংস্কার কাজ শুরু করে। পুরনো পাথর খুলে তা পালিশ করে নতুনভাবে বসানোর পর ২০২৬-এর শুরুতে মন্দিরটি তার আদি রূপ ফিরে পায়।

বেনারসের ব্রাহ্মণদের বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণে শুদ্ধিকরণ যজ্ঞ


৩. শুদ্ধিকরণ উৎসব: বেনারসের ব্রাহ্মণ ও মহারাজগণের উপস্থিতি 

১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই পুনঃপ্রতিষ্ঠা কর্মসূচিটি ছিল এক বিশাল আধ্যাত্মিক মহোৎসব।
• বেনারসের ২০ ব্রাহ্মণ: উত্তরপ্রদেশের বেনারস (বারাণসী) থেকে আগত ২০ জন প্রথিতযশা ব্রাহ্মণের বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণে চারপাশ মুখরিত হয়ে ওঠে।
• তারকেশ্বরের মহারাজের তত্ত্বাবধান: তারকেশ্বর মন্দিরের পূ্য মহারাজগণের সরাসরি উপস্থিতিতে শাস্ত্রীয় বিধি মেনে ভূমিশুদ্ধিকরণ ও মহামৃত্যুঞ্জয় যজ্ঞ সম্পন্ন হয়।

৪. পবিত্র বারিধারা ও দূর-দূরান্তের ভক্তি 

শুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আবেগপূর্ণ দৃশ্য ছিল পবিত্র জল সংগ্রহের পদযাত্রা।
• কলস যাত্রা: প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার পুণ্যার্থী মহিলা দ্বারকেশ্বর নদ থেকে কলস ভরে পবিত্র জল নিয়ে এসে মন্দির প্রাঙ্গণ ধৌত করেন।
• দূরবর্তী পবিত্র ঘাট: শুধু স্থানীয়রা নন, বহু যুবক ভক্ত দক্ষিণেশ্বর মন্দির ঘাট, শুশুনিয়া, শিলাবতী এবং শ্যাওড়াফুলি থেকে পবিত্র জল বহন করে এনে এই ঐতিহাসিক শুদ্ধিকরণে অংশগ্রহণ করেন।

আলোকসজ্জায় সজ্জিত ষাঁড়েশ্বর মন্দির


৫. অপরূপ সাজসজ্জা: ফুল ও আলোর মায়াবী জগত 

সংস্কার পরবর্তী এই মাহেন্দ্রক্ষণকে মহিমান্বিত করতে করা হয়েছিল অভাবনীয় সাজসজ্জা:
• পুষ্পসজ্জা: হাজার হাজার টাটকা গাঁদা ফুলের মালায় মুড়ে ফেলা হয়েছিল ল্যাটেরাইট পাথরের দেওয়াল।
• রাতের দৃশ্য: সন্ধ্যার পর আধুনিক লেজার ও কৃত্রিম আলোকসজ্জায় মন্দিরটি যখন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তখন মনে হচ্ছিল যেন কোনো দেবপুরী মর্ত্যে নেমে এসেছে।

৬. জনজোয়ার ও রেকর্ড সৃষ্টিকারী প্রসাদ বিতরণ 

মন্দির কমিটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই উৎসব বিষ্ণুপুরের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েছে।
• লক্ষাধিক ভক্তের সমাগম: সারা জেলা ও ভিন জেলা থেকে মানুষ ছুটে এসেছেন বাবার চরণে আশীর্বাদ নিতে।
• ৪০ হাজার ভক্তের ভোজ: ভক্তদের জন্য প্রায় ৪০ হাজার মানুষের খিচুড়ি, মহাপ্রসাদের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বর্তমানে ভক্তদের সুরক্ষায় মন্দিরের চারদিকে পাঁচিল নির্মাণের কাজও দ্রুতগতিতে চলছে।

৭. চৈত্র গাজনের প্রত্যাবর্তন 

গত ছয় বছর সংস্কারের কারণে গাজন উৎসব পাশের শৈলেশ্বর মন্দিরে পালিত হচ্ছিল। কিন্তু এবার থেকে বাবা ষাঁড়েশ্বরের চৈত্র গাজন পুনরায় তাঁর নিজের প্রাঙ্গণেই মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হবে। ২১ ফেব্রুয়ারি বাবা ভৈরব রাজের ঘরে ফেরার মাধ্যমে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের এক অধ্যায় সমাপ্ত হলো।

উপসংহার 

বিষ্ণুপুরের ডিহর গ্রামের এই ষাঁড়েশ্বর মন্দির পুনর্প্রতিষ্ঠা কেবল একটি স্থাপনার মেরামত নয়, এটি আমাদের কয়েকশ বছরের পুরনো ভক্তি ও বিশ্বাসের জয়। বেনারসের ব্রাহ্মণদের চণ্ডীপাঠ আর দূর-দূরান্তের পবিত্র জলের ধারায় সিক্ত এই ধাম আজ এক মহাপুণ্যতীর্থে পরিণত হয়েছে।

জয় বাবা ষাঁড়েশ্বর! জয় বাবা ভৈরব রাজ!

💢আপনার মতামত জানান
আপনি কি কখনো বাবা ষাঁড়েশ্বরের এই ঐতিহাসিক মন্দির দর্শন করেছেন? সংস্কারের পর এই নতুন রূপ আপনার কেমন লেগেছে? আপনার অভিজ্ঞতা নিচের কমেন্ট বক্সে আমাদের জানান।


তথ্যসূত্র: স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা, মন্দির কমিটির বিবরণ ও সাম্প্রতিক সংবাদসূত্র থেকে সংকলিত।

Post a Comment